শাহরিয়ার কবির বিদ্যুৎ
নতুন একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন করা কি আসলেই সম্ভব? এবার খুঁজব সেই প্রশ্নের উত্তর । ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোর মধ্যে মিজোরামে ৮৭ শতাংশ , মেঘালয়ে ৭১ শতাংশ , এবং নাগাল্যান্ডে ৮৮ শতাংশ মানুষ খিস্টান ধর্মাবলম্বী। কিন্তু এই রাজ্যগুলো পাশাপাশি নয়। তবে মিয়ানমারের চিন প্রদেশের ৯৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী খ্রিস্টান। ভারত ও মিয়ানমারের এই প্রদেশগুলোর সাথে মণিপুর ও অরুণাচলকে সংযুক্ত করলে ২ লাখ বর্গ কিলোমিটারের বিশাল একটি বড় ভূখন্ড তৈরি হয়। এ প্রদেশ দুটিতে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা যথাক্রমে ৪১ ও ৩০ শতাংশ । আবার বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী রয়েছে। তবে ধর্মের চেয়েও উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে- চিন, মিজোরাম , মণিপুর ও বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়িরা নৃতাত্ত্বিকভাবে জো জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত । অর্থাৎ, এখানে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠন করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়।
কীভাবে এই রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে ? দুইটি উপায়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে ।
১. বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের ট্রাইজংশন এলাকায় নতুন খ্রিস্টান রাষ্ট্র
২. মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সাথে প্রথমে বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে জুড়ে দেয়া । পরবর্তীতে এর সূত্র ধরে ট্রাইজংশন অংশকেও একত্রিত করে ফেলা ।

যদি বাংলাদেশ ব্যতীত ভারত ও মিয়ানমারের অংশ নিয়ে খ্রিস্টান রাষ্ট্রের উত্থান ঘটে, তবে এটি টেকসই হবে না। কেননা , ভৌগোলিকভাবে এটি হবে ল্যান্ডলক রাষ্ট্র। আর ল্যান্ডলক রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখা প্রায় আসম্ভব । ফলে, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলকে ছিনিয়ে নিতে পারলে সমুদ্র ও সামুদ্রিক বন্দর দুটোই হাতে পাওয়া যাবে । তবে এটি বেশ কঠিন হওয়ায় সম্ভবত দ্বিতীয় পথে হাঁটছে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়েরা । সেলক্ষ্যে নতুন করে আরো প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করা হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী পাসপোর্ট প্রদান করা হয়েছে। এসব করে মূলত মিয়ানমারের সাথে যুদ্ধ বাঁধানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আর সেকারণেই মানবিক করিডোরের নামে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে সরাসরি সহায়তা করার পাঁয়তারা করা হচ্ছিল। ইতোমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক ত্রাণের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ থেকে ১৭০ মিলিয়ন ডলার কমিয়ে দিয়েছে । জাতিসংঘের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিও ৫০ ভাগ কমিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি । এর অর্থ দাঁড়ায় যে, সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নতুন করে কৃত্রিম একটি অস্থিরতা তৈরি করা হচ্ছে এবং মানবিক করিডোরের বিষয়টিকে জনপ্রিয় করার অপচেষ্টা হচ্ছে। অন্যদিকে, ভারতের ধমকেই হোক কিংবা বিবেকের তাড়না থেকেই হোক, বাংলাদেশের সেনাপ্রধান করিডোর ইস্যুতে “নো ব্লাডি করিডোর ” বলে হুংকার দেবার পর প্ল্যান -এ থেকে সরে এসে বি-তে যায় ড. ইউনূস।
সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরকে উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেয়া হয়। ত্রিশ বছরের জন্য বন্দরের নিউমুরিং টার্মিনালকে বিদেশীদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ার পর হাইকোর্টে রিট হলে, আদালত প্রথমে চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে। এরপর বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর তোড়জোড়ে আদালত তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। চুক্তির বিরুদ্ধে আন্দোলন করা শ্রমিকদের তালিকা প্রস্তুত করে শাস্তি চেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে।
এখন বুঝতে হবে ডিপি ওয়ার্ল্ড কী এবং এর পেছনে কারা ? ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিকানায় রয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সুলতান বিন সুলায়েম। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে ইজরায়েল। বিন সুলায়েম আবার এপস্টাইন নেটওয়ার্কের উচ্চ স্তরের সদস্য। সেদিক বিবেচনা করলে বিন সুলায়েম ও ইউনূস একই গোয়ালের গরু। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৬ টি পোর্টের দায়িত্ব পেতে যাচ্ছিল ডিপি ওয়ার্ল্ড। কিন্তু ৯/১১ এর ঘটনার পেছনে বিন সুলায়েমের হাত আছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড হুমকি স্বরূপ- এসব বিবেচনায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে গণ আন্দোলন শুরু হলে বুশ প্রশাসন পিছু হঁটে এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দরের দায়িত্ব দেবার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। কিন্তু ইজরায়েলের বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব পায় ডিপি ওয়ার্ল্ড । মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রের একটি কোম্পানি কেন ইজরায়েলের বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব পাবে, এতদিন তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও এপস্টাইন ফাইল খোলাসা করে দিয়েছে সবকিছু। ডিপি ওয়ার্ল্ডের পেছনে রয়েছে ইজরায়েল এবং তাদের স্বার্থই হাসিল করে কোম্পানিটি।

চট্টগ্রাম বন্দরের মূল সমস্যা হচ্ছে কাস্টম দুর্নীতি। সেই দুর্নীতি দমন না করে বিতর্কিত ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বন্দর ইজারা দেবার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে? সুদান , সোমালিয়াসহ বিশ্বের অনেক দেশেই মার্কিন ও ইজরায়েলি স্বার্থ বাস্তবায়ন করার প্রমাণ রয়েছে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিরুদ্ধে। তারা শুধু বন্দর দেখা শোনাই করে না, সাথে গোপন সামরিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। অর্থাৎ করিডোর না পেয়ে তার বিকল্প হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে চট্টগ্রাম বন্দরে নিয়ে এসে কল্পিত খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করা হবে। সংস্কার ছিল মূলত গোলক ধাঁধাঁ । আর সেকারণেই সংস্কারের বিষয়গুলো নির্বাচিত সরকারের উপর ছেড়ে দিয়ে বন্দর ইজারা দিতে মরিয়া ছিল ইউনূস। দেশ বিরোধী এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশবাসী যেন কিছুই বুঝতে না পারে,সেজন্য চুক্তির দিন শেখ হাসিনার ফাঁসির রায় ঘোষণা করে জনগণকে অন্য ইসুতে ব্যস্ত রাখে।
এবার আলোচনা করা যাক জামায়াত প্রসঙ্গে। দলটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই পশ্চিমাদের লাঠিয়াল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। উপমহাদেশ যেন ব্রিটিশ উপনিবেশের কবল থেকে মুক্ত হতে না পারে সেজন্য ব্রিটিশদের অর্থ ও চিন্তায় দলটি প্রতিষ্ঠিত বলে প্রমাণ রয়েছে। ভারতের সাথে তাদের খারাপ সম্পর্কের কারণ যতটা না ধর্মীয়, তারচেয়ে বেশি ভূ-রাজনৈতিক। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ৫০ লাখ মানুষ তৈরি আছে বলে ঘোষণা দেন । অর্থাৎ , মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী লাল দুহোমা ও জামায়াতের লক্ষ্য একই। আর তাদের লক্ষ্য কারা নির্ধারণ করে দিয়েছে এবার যাব সেই আলোচনায়।

যে জামায়াত সারা জীবন ইউনূসকে সুদখোর ও জাহান্নামী বলে এসেছে,সেই জামায়াতের সাথেই ঘর বেঁধেছেন ইউনূস। ইউরোপিয়ান জামায়াতের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা একটি আলোচনায় জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতে জামায়াত ও ইউনূস একই লবিস্ট ফার্মে যৌথভাবে অর্থ ঢেলেছে । এদিকে এপস্টাইন ফাইলের নথি বলছে, জামায়াত নেতা মীর কাশেম আলীর ভাই মীর মাসুমের স্ত্রী শাহানা মাসুম মীরা নায়ারের মাধ্যমে বিশ্ব নিয়ন্ত্রকদের সাথে সংযুক্ত। মীরা নায়ার হচ্ছেন নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র মামদানির মা। নির্বাচনে জেতার পর মামদানি যে বাংলাদেশী আন্টিকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন, তিনিই হচ্ছেন শাহানা মাসুম। এভাবেই জামায়াত ও ইউনূস একে অপরের পরিপূরক হয়েছে। এপস্টাইন ফাইলের নথিতে বিএনপি নেতা আব্দুল আউয়াল মিন্টুর নামও এসেছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্র্যাকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর জুলাই কাণ্ডে ব্র্যাকের ভূমিকা নিয়ে দেশবাসী এখন বেশ অবগত। এই ব্র্যাকের পেছনে রয়েছে আবার আরেক গ্লোবালিস্ট, যিনি ড. ইউনূসের গুরু হিসেবে পরিচিত। তার নাম জর্জ সরোস। সরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন, ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংক, আর বিল ক্লিনটনের ক্লিনটন ফাউন্ডেশন – এরা সব একই সূত্রে গাঁথা । আর এদেরকে প্রভু হিসেবে মেনে নিয়েছে জামায়াত ও বিএনপি। জামায়াত-বিএনপির প্রভুরা এই অঞ্চলে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখছে। ক্ষমতার হালুয়া রুটির লোভে দেশ ও জাতির স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে তাই দল দুটি প্রভুদের স্বার্থ রক্ষায় নেমেছে ।
লেখকঃ রাজনীতিবিদ ফেসবুক লিংকঃ https://www.facebook.com/shahriarkabir.biddut
সম্পর্কিত খবর





Add comment