সমসাময়িক সময়ে এমন হেঁটে হেঁটে অফিস করতে দেখেছিলাম সাবেক মন্ত্রী “পলক” ওরফে আইসিটি পলককে। সময়টি তখন ভাইরাল যুগের আদি স্তর। শেরে বাংলা নগর বা আগারগাঁও-তে পলককে হাঁটা বাবা রূপে হাঁটতে দেখা গেল। দন্ত বিকশিত করে হাঁটার সে ভিডিও মুহূর্ত ভাইরাল হলো । দল-মত নির্বিশেষে সকলের সমালোচনার পর তাকে আর হাঁটা বাবা রূপে ফের দেখা যায়নি। পলক এখন জেলে। নিয়মিত মোনাজাত করে, টিভি ক্যামেরা দেখলেই দোয়া চায়। তার বউ ওরফে কনিকা ভাবী এখনো টিউশন করে সংসার চালায় কিনা, জানা যায়নি।

এই ঢাকা শহরে সত্যি সত্যি একজন হাঁটা বাবা ছিলেন। তার নাম হায়দার বাবা। মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা। মাথায় জটায়ু চুল, পরনে নোংরা পোশাক।কথা বলত না কারো সাথে। শুধুই হাঁটত। তার পেছনে জনা ত্রিশেক মানুষও হাঁটত। কারো হাতে জুস,তো কারো হাতে ছাতা, কারো হাতে আবার বিরিয়ানির প্যাকেট। নুর জাহান রোডের এক প্রবাসী তার বাসার নিচ তলা বাবার বিশ্রামের জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। সে বিশ্রামাগারে প্রতিদিন সিন্নি রান্না হত। হাঁটা বাবার মুরিদরা বলত, বাবা কারো সাথে কথা বলেন না,কারো দিকে তাকান না । যদি কারো পানে মুখ তুলে তাকান, তাহলে তার ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। অনেকেই নাকি বাবার তাকানোতে বড় লোক হয়ে গেছে। হাঁটা বাবাও একদিন মারা গেল।ভক্তদের সেকি আহাজারি! সলিমুল্লাহ রোডের কবর স্থানে মাজার বানানোকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসার ছাত্রদের সাথে বাবা ভক্তদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেঁধেছিল। মাদ্রাসার ছাত্র তথা তালিবুল ইলমদের দাবি, যে লোক জীবনে গোসল করেনি,নামাজ পরেনি -তার আবার মাজার হয় কীভাবে? অন্যদিকে বাবা ভক্তদের দাবি,বাবা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। সকল কিছুর ঊর্ধ্বে থাকা সেই হাঁটা বাবার অবশ্য পূর্ণাঙ্গ মাজার আজও হয়নি। তারচেয়ে বরং বলা ভালো, হতে দেওয়া হয়নি।

ভাইরাল সময়ের এখন মধ্য যুগ চলছে। আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের এই যুগে কে এক্টিং করছে, আর কে ওভার এক্টিং করছে-সকলেই তা বুঝতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্ভবত ফেসবুকে রিল দেখে সময় পার করতেন। কিংবা টিকটকে মাতোয়ারা ছিলেন বলেই ধরে নেয়া যায়। নইলে ভাইরাল হওয়ার নেশা তাকে এভাবে অষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরত না। এদেশে ভাইরাল হওয়া অবশ্য খুবই সোজা । ভাইরাল হলে হিরো হওয়া যায়, গায়ক হওয়া যায়, শো-রুম উদ্বোধন করা যায়, ফ্যান-ফলোয়ারে সামাজিক মাধ্যম সরগরম থাকে সব সময়। কিন্তু ভাইরাল হওয়া কেউ আজ অবধি শান্তিতে থাকেনি। কোনো না কোনোভাবে তারা জেলের ভাত খেয়েছেন। এই যেমনঃ হিরো আলম,গায়ক নোবেল,ডাক্তার সাবরিনা, প্রতারক শাহেদ……তবে এরা কেউ হাঁটা বাবা ছিল না। হাঁটা বাবা হওয়ার জন্য রাজনৈতিক অথবা ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হতে হবে।

এদিকে প্রাক-ভাইরাল যুগেও অনেকেই হাঁটতেন। সে হাঁটার কথা আবার রসিয়ে রসিয়ে কবিতাতে তুলে ধরতেন। এই যেমনঃজীবনানন্দ দাশ। তিনি তার কবিতায় লিখেছেনঃ হাজার বছর আমি হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।এত কিছু সত্ত্বেও জীবন্ত ভাইরাল ছিলেন না জীবনানন্দ দাশ। বরং মৃত্যুর বছর পঁচিশেক পর ভাইরাল হয়েছেন। বাংলা সাহিত্য যতদিন আছে, ততদিন জীবনানন্দ দাশও টিকে থাকবেন। বাকিরা কালের খেয়ায় হারিয়ে গেছে,যাচ্ছে,যাবে।






Add comment