আয়নাবাজি যদি হয় “আর্ট”, ইউনূস তাহলে পারফেক্ট আর্টিস্ট । ১৯৫০ -১৯৬০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া , আফ্রিকা এবং লাতিন আমেরিকায় ক্ষুদ্র ঋণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে । এই থিমকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র ঋণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূস ।
সখিনার গায়ে কাপড় ছিল না বলে অনেকেই কাপড়ের ব্যবসা করে বড় লোক হয়ে গেছে । ইউনূসও তেমনি এক কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের সময় বড় লোক হবার সুযোগ পেয়েছে । যে কোনো সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রীয় সংকটের সময় চালাক-চতুর শ্রেণীর মানুষ নিজেদের পুঁজি বাড়িয়ে ফেলে, অন্য শ্রেণীর মানুষ সেই সংকটের বলি হয় । চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ অনেক মানুষকে নাজেহাল করলেও ইউনূসকে করেছে ধনী । যদিও তিনি বলার চেষ্টা করছেন , সেই দুর্ভিক্ষ উপশমে নাকি উনার ব্যাপক অবদান ছিল ! আসলেই কি তাই ?
তথ্য বলছে , চুয়াত্তরে ইউনূস ৪২ জন নারীকে ২৭ ডলার ঋণ দিয়েছিলেন । সেই ঋণ পেয়ে নারীরা নাকি বাংলাদেশী টাকায় ৫০ পয়সা করে লাভ করেছিলেন । এত বড় অবদানকে কি অস্বীকার করা যায় ? এই লাভের গুঁড় খেয়েই তো তিনি শুরু করে দিলেন আধুনিক দাদন প্রথা তথা মাইক্রোক্রেডিট ব্যবসা ।
মাইক্রোক্রেডিট নাকি বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রেখেছে । সেজন্য ইউনূসের সাথে গ্রামীণ ব্যাংককেও দেয়া হয়েছে নোবেল শান্তি পুরস্কার । অথচ, পরিসংখ্যান বলছে – বাংলাদেশের জিডিপিতে ক্ষুদ্র ঋণের পরোক্ষ অবদান ২-৩ শতাংশ বলে ধারণা করা হয় । অর্থাৎ, বাংলাদেশের জিডিপিতে ক্ষুদ্র ঋণের প্রত্যক্ষ কোনো অবদান নেই ।

ইউনূসের আয়নাবাজির আসল রূপ ধরা পড়ে নোবেল পুরস্কার পাবার পর । এক আসন্ন ঘোলাটে পরিস্থিতিতে ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে দেখানো হয় ইউটোপিয়ান গালগপ্পো । ক্ষুদ্র ঋণের প্রথম গ্রহীতা হিসেবে সুফিয়া বেগম কীভাবে তার জীবন বদলে ফেলেছেন , সেই গল্পই সেলুলয়েডের ফিতায় তুলে ধরা হয় নরওয়ের অসলোতে । কিন্তু , ’Weekly Blitz’ বের করে এনেছে আসল সত্য ।
কুঁড়ে ঘরের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে আজ দ্বিতল বাড়ির মালিক –এমনটাই দেখানো হয়েছিল নোবেল কমিটির সামনে । আদতে বাড়িটি ছিল সুফিয়ার প্রতিবেশী দুবাই প্রবাসী জাবেল হোসাইনের । ডকুমেন্টারিটি দেখার পর জাবেলের তো মাথায় হাত ! যদি সুফিয়া তার বাড়িটিকে সত্যি সত্যি নিজের বলে দাবি করে বসেন , তাহলে কী হবে ? এই শঙ্কা থেকে তিনি গ্রামীণ ব্যাংক বরাবর অভিযোগ দিলেন । কিন্তু, সে অভিযোগের উত্তর দেবার প্রয়োজন বোধ করেনি ইউনূস কিংবা গ্রামীণ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কেউ ।
শুধু তাই নয় , সুফিয়ার ছোট মেয়ে নুরুন্নাহার জানিয়েছিলেন – গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নেবার পর তাদের উপকার হওয়া তো দূরে থাকুক , বরং সুদসহ কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে অন্যান্য উৎস থেকে আরো অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঋণের দুষ্টু চক্রে পড়তে হয়েছিল তাদের ।
ড্যানিশ সাংবাদিক টম হেইনেম্যান নরওয়ের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন NRK-তে ‘Caught in Micro debt’ নামে একটি ডকুমেন্টারি প্রচার করেন । যাতে ইউনূসের আয়নাবাজির আরেক দফা উঠে আসে । সুফিয়ার দুই মেয়ে নুরুন্নাহার এবং হালিমা জানান, বেঁচে থাকার তাগিদে তারা এখন ভিক্ষা করেন । তাদের চেয়েও করুণ পরিণতি বরণ করেছিলেন সুফিয়া । তার মৃত্যুর পর এলাকাবাসীদের দেওয়া অর্থে কাফন-দাফন সম্পন্ন হয়েছিল ।
ইউনূস তার বান্ধবী এবং সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটনকে বিমোহিত করতে গ্রামীণ ব্যাংকের একটি প্রজেক্টের নাম রাখেন “হিলারি আদর্শ ।” রিশি পল্লীতে অবস্থিত এই প্রজেক্টটি পরিদর্শন করতে আসেন হিলারি ক্লিনটন । তার পরিদর্শনের পর ফুটে ওঠে আসল চিত্র । পুরো গ্রামটি ঋণের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে যায় । ফলস্বরূপ, দারিদ্র্যতা , খাদ্যাভাব দেখা হয় । কেউ কেউ আত্মহননের পথও বেছে নেন । অনেক পিতামাতাই বেঁচে থাকার তাগিদে তাদের সন্তানদের বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন এবং অনেক নারীই পতিতাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে বেছে নেন । আজও বাংলাদেশের আনাচেকানাচে-তে কান পাতলে ক্ষুদ্র ঋণে জর্জরিত মানুষের হাহাকার শুনতে পাওয়া যায় ।

মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি হয় ক্ষমতা অর্জন করা , তাহলে ইউনূস হচ্ছেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ । বাংলাদেশের আইনে সরকারী, বেসরকারী এবং বিশেষায়িত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে বয়সসীমা ষাট পর্যন্ত থাকলেও ইউনূস তা মানেননি । এ নিয়ে বাংলাদেশ সরকার তাকে চ্যালেঞ্জ করলে , তিনি মার্কিন দূতাবাসকে কাজে লাগান । উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া নথি Cable: 09DHAKA469তে ইউনূস মার্কিন দূতাবাসকে বলেন যে, তিনি Grameen Bankএর চেয়ারম্যান নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমাতে চান ও এটা ব্যাংকের বোর্ডের করা উচিত।
Cable: 07KOLKATA50তে দেখা যায় , ইউনূস বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছেন, রাজনৈতিক দল গঠনের কথা বিবেচনা করেছিলেন এবং রাজনীতিতে নামার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন।
Cable: 07DHAKA623তে ইউনূস একটি সামরিকসমর্থিত “জাতীয় ঐক্য সরকার”এ অংশগ্রহণ না করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন , এবং বলেন: “আমি জনগণের কাছ থেকে নিজের পথ হাসিল করে ক্ষমতা অর্জন করতে চাই, কারণ একটি জাতীয় ঐক্য সরকার মূলত একটি অভ্যুত্থানের সমতুল্য হবে এবং আমি এতে অংশগ্রহণ করবো না।”
অর্থাৎ, ২০০৭ সালের ১/১১’র ঘোলাটে পরিস্থিতিতে তিনি দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করেছিলেন। সেলক্ষ্যে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সাল “নাগরিক শক্তি” নামে একটি রাজনৈতিক দলও খুলে বসেন । এই দল খোলার আগে ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি ডেইলি স্টারে জনগণের উদ্দেশ্যে একটি খোলা চিঠি লেখেন । কিন্তু জনগণ তাকে গ্রহণ না করায় , শেষ পর্যন্ত ২০২৪ -এ এসে সেই মেটিক্যুলাস ডিজাইনের ক্যু করেই ক্ষমতা দখল করলেন ।

তার রাজনৈতিক অভিলাষ যে দীর্ঘদিনের , তা ১৯৯৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার পদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় । ক্ষমতার এই মধু হয়ত তাকে পাগল করে তুলেছিল । আর তাই ,২০০৬ সালের শুরুতেই তিনি রেহমান সোবহান , হাবিবুর রহমান , কামাল হোসেন, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম , দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যদের নিয়ে শুরু করলেন জাতীয় নির্বাচনে ‘সৎ ও পরিচ্ছন্ন প্রার্থী’র ক্যাম্পেইন । যা আদতে রাজনীতিতে বিরাজনীতিকরণের ফর্মুলা ছিল । উইকিলকসের ফাঁসকৃত একটি নথি বলছে, ২০০৭ সালের একটি মার্কিন ডিপ্লোম্যাটিক ক্যাবলে বলা হয়েছে – ইউনূস ভাবতেন বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন, এবং শেখ হাসিনা –খালেদা জিয়ার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে নতুন কিছু করা উচিৎ ।
এজন্যই হয়ত ভুসুকুপা চর্যাপদে লিখেছিলেন – আপনা মাংসে হরিণা বৈরী । অর্থাৎ , নিজের মাংসের জন্যই হরিণ নিজের শত্রু । নয়ত , যে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্র্যান্ডিং করেছেন , সরকার প্রধান হিসেবে ব্যাংকটিকে ৪০০ কোটি টাকার সহায়তা করেছেন , গ্রামীণ ফোনের মাধ্যমে ইউনূসকে মনোপলি ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছেন ; তাকেই কিনা রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করেছেন ইউনূস । অর্থাৎ, শেখ হাসিনার ঔদার্যই তার নিজের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল ।

গল্পগুলো এখানেই শেষ হলে পারত , কিন্তু হয়নি । কারণ ক্ষমতার লোভ মানুষকে অন্ধ বানিয়ে দেয় , শত্রুর সাথেও রাত কাটাতে বাধ্য করে । ক্ষমতা প্রাপ্তিতে এত অল্পতেই কেন রণে ভঙ্গ দিবেন ইউনূস ? তাকে তো হতে হবে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় ! আর তাই, গ্লোবালিস্ট ও ডিপ স্টেটের পালের গোদা জর্জ সরোসের ফ্যানবয় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে থাকলেন তিনি । মার্কিন ডেমোক্র্যাটরা দেশে দেশে নির্বাচিত সরকার ফেলে দেবার যে সব চক্রান্ত করত , তাতে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রদান করে সহায়তা করতেন সরোস । আরব বসন্তের নামে মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করতে কত নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরেছে , পৃথিবীর এ প্রান্তে – ও প্রান্তে কত মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে – তার হিসেব কে রাখে ? কিন্তু এসব অনাচারের পেছনে ইউনূস ও তার গুরু সরোসের বড় অবদান আছে ।

বাংলাদেশের জুলাই কাণ্ডে ইউএসএইডের ২৭ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে সরোসের ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশন এবং ইউনূসের কত টাকা ছিল , তা হয়ত কোনোদিনও জানা যাবে না । কিন্তু কিছুটা তো আন্দাজ পাওয়া যাবে । ইউরোপিয়ান জামায়াতের মুখপাত্র ব্যারিস্টার আবু বকর মোল্লা একটি আলোচনায় বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতে জামায়াত ও ইউনূস একই লবিস্ট ফার্মে যৌথভাবে অর্থ ঢেলেছে ।
আহ! ক্ষমতা । বাহ! ক্ষমতা । যে জামায়াত সারা জীবন ইউনূসকে সুদখোর ও জাহান্নামী বলে এসেছে , সেই জামায়াতের সাথেই ঘর বেঁধেছেন ইউনূস । আর তাই, রিসেট বাটন পুশ করে মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে বদ্ধ পরিকর তিনি । যদিও বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোপাল ভাঁড় তুল্য প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে ইউনূসের বড় অবদান ছিল , কিন্তু তিনি কোনো স্বীকৃতি নেননি ! যে মানুষ গ্রামীণ ব্যাংকের পদ ছাড়তে নারাজ, তিনি মুক্তিযুদ্ধের মত এত বড় একটি ঘটনায় স্বীকৃতি আদায় করা ছেড়ে দিবেন ? যার রেকর্ডে বিদেশী সহায়তা ও পুরস্কার নয়-ছয় করার ইতিহাস আছে , তিনি সুযোগ পেলে মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট অর্জন করা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন ? তিনি যদি মুক্তিযুদ্ধের প্রতি কিঞ্চিৎ মায়া অনুভবও করতেন – তাহলেও হয়ত স্মৃতিসৌধ কিংবা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে গিয়ে ভুল করতেন না । কিংবা বিগত ৫৪ বছরে এক বারের জন্য হলেও তাকে জাতীয় দিবসে এসব স্থানে দেখা যেত ।

ভিশনারি ইউনূস এক সময় নাকি মিশনারি ইউনূসে পরিণত হয়েছিলেন বলে বাজারে চাউর আছে । ভেরা ফোরেস্তেনকো-কে বিয়ে করে পশ্চিমা জামাই সাজতে গিয়ে তিনি নাকি খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন । সে কারণেই কিনা, কে জানে ! ইদগা ময়দানে নামাজ আদায় করতে গিয়ে ভুল করে বসেন বিশ্বের প্রভাবশালী এই মুসলিম ব্যক্তিত্ব ।

ইদানীং থ্রি জিরো তত্ত্ব দিয়ে বিশ্ব জয় করার গল্প শোনান ড. ইউনূস । যদি প্রশ্ন করা হয় ,বাংলাদেশের দুর্যোগ-দূর্বিপাকে তিনি কোথায় ছিলেন ? কোনো সদুত্তর দিতে পারবেন ? পারবেন না । কিন্তু, ৪০-৭০ শতাংশ সুদের হিসেব তিনি ঠিকই দিতে পারবেন ।
তিনি নাকি বাংলাদেশে সংস্কার আনবেন । কেমন সংস্কার করবেন , তা ষোল মাসেই বুঝে গেছে দেশবাসী । প্রতিষ্ঠা করেছেন এনজিওগ্রাম সরকার , সেই সরকারের মাঝে শুধু তারই আত্মীয়-স্বজন । পিপলস’স রিপাবলিক অফ বাংলাদেশ আজ তাই ব্যানানা রিপাবলিকে পরিণত হয়েছে ।
একদিন যাদের চোখে তিনি ছিলেন সুদখোর শাইলকের প্রতিচ্ছবি – নিরেট জাহান্নামের কীট ; ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারায় তিনিই আজ তাদের কাছে কালেমার পতাকাবাহী আমিরুল মু’মিনিন । এমন আয়নাবাজি , এ জাতি- এ সভ্যতা আগে কখনো দেখেছে !
(ডিসেম্বর,২০২৫ সালে লিখিত)





Add comment