২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে আদতে কোনো রাজনীতি ছিল না। বরং তা ছিল স্নাইপার-স্নাইপার খেলা। বহুমাত্রিক ও বহু প্যাটার্নের এই খেলায় আজ আমরা একটি প্যাটার্ন নিয়ে আলোকপাত করব। যেহেতু জুলাই-আগস্টে স্নাইপারের মালিক একক কেউ ছিল না, কাজেই সব পক্ষকে হয়ত বের করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না ।কিন্তু প্যাটার্ন খুঁজে খুঁজে আমাদের বুঝতে হবে ,এদের উপরের স্তরে কারা ছিল। যাত্রাবাড়ী ও বাংলা মোটরের দুটি ঘটনা প্রায় একই প্যাটার্নে সংঘটিত হয়েছে। ফলে এই দুই স্থানে একই দল অপারেশন চালিয়েছে । এই দলগুলোর কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে আমরা বুঝতে পেরেছি, অনেকগুলো দলকে আন্তঃসংযোগ ছাড়াই মাঠে নামানো হয়েছিল। অর্থাৎ এক দল আরেক দলকে চিনত না ।কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল একই ।

কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক। আগস্টের শুরুর দিকেই আমাদের কাছে খবর আসতেছিল স্থানীয় কিছু বাড়ি-ঘরকে টার্গেট করে গুজব ছড়ানো হচ্ছিল, এই বিল্ডিং থেকেই গুলি চালানো হয়েছে। সে সব বাড়ি-ঘরে হামলা চালায় তথাকথিত ছাত্র-জনতা। বস্তুত ঐ সব বাড়িতে সরকারি কর্মকর্তা কিংবা সরকার দলীয় কোনো নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা বসবাস ছিল ।
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া কলেজের সামনে যে ওভারব্রিজ, সেখানে বিল্ডিং থেকে আসা গুলিতে আন্দোলনকারীদের মধ্যে কেউ কেউ হতাহত হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। ঐ ঘটনার পরেই মূলত উত্তপ্ত যাত্রাবাড়ী জাহান্নামে পরিণত হয়। স্পটের আশেপাশে বসবাস করা একজন সরকারি কর্মকর্তার উপর দায় চাপিয়ে দিয়ে তাকে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়।পরিস্থিতি বুঝতে পেরে সেই কর্মকর্তা কোনোমতে জীবন নিয়ে পালিয়ে আসে। তার দাবি, আমি জুলাইয়ের শেষ দিক থেকেই ঐ এলাকায় যাতায়াত করি না। কিন্তু আগস্টের শুরুতে কিছু প্রয়োজনীয় কাজের জন্য আমার ভাড়া বাসায় যেতেই হয়। আর তখনই আমি হামলার সম্মুখীন হই এবং পালিয়ে আসতে পারি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়া হয়,আমার বিল্ডিং এর আমার ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে গুলি চালিয়ে আন্দোলনকারীদের হত্যা করা হয়েছে । তার এই বক্তব্যের জেরেই মূলত আমরা তদন্তে নামি । ঐ বিল্ডিং -এ গুলি চালানোর মত আর কে থাকতে পারে? নাকি ঐ কর্মকর্তা যেহেতু সরকার দলীয় পেশাজীবী একটি সংগঠনের সাথে জড়িত ছিল, সেজন্য তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আরোপ করে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে? কিন্তু স্থানীয় লোকজন আমাদের জানিয়েছেন, ঐ বিল্ডিং থেকে রাতের বেলা সত্যি সত্যি গুলি চালানো হয়েছে। তারমানে ঘটনা সত্য। এবার বিল্ডিং এর ভাড়াটিয়াদের হাল হকিকত জানার চেষ্টা করি। জুলাইয়ের মাস দুয়েক আগে ঐ বিল্ডিং এ ব্যাচেলর হিসেবে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয় কিছু লোক। যদিও তারা ছাত্র পরিচয়েই ভাড়া নিয়েছিল। জুলাই কাণ্ডের সময় যেহেতু তারা আন্দোলনের অগ্রভাগে ছিল, সেজন্য তারা মোটামুটি ঐ এলাকার লিডারশিপে চলে আসে। রহস্যজনক ব্যাপার হচ্ছে, ঐ কর্মকর্তার ঠিক নিচের ফ্ল্যাটটিই ভাড়া নিয়েছিল তারা। এবং ঐ বিল্ডিং থেকে গুলি চালানো হলে কারা তা চালিয়েছে- মোটামুটি তা পরিষ্কার এখন । কিন্তু আমাদের দরকার প্রমাণ । আগস্টের ৫ তারিখের পর লিডারশিপে চলে আসা ঐ ব্যাচেলররা নিজেদের শিবির হিসেবে ঘোষণা করে।
রাজধানীর পরীবাগ থেকে বাংলা মোটর পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু বিল্ডিং কে টার্গেট করে প্রচারণা চালানো হয় যে, এসব বিল্ডিং থেকে আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালানো হয়েছে। বস্তুত ওসব বিল্ডিং এ সরকার ঘনিষ্ঠ নেতা ও কর্মকর্তাদের বসবাস ছিল। ছিল তাদের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এত বড় বড় বিল্ডিং এ শুধু তারাই থাকত না, আরো হাজারে হাজারে মানুষও বসবাস করত। আগস্টের প্রথম দিক থেকেই এসব বিল্ডিং এ নিয়মিত হামলা চালানো হচ্ছিল। ফলে সরকার ঘনিষ্ঠ কারোরই আর এই এলাকায় বসবাস করা সম্ভব ছিল না। আবার বৈষম্য বিরোধীরা বারবার অভিযোগ করে আসছিল, তাদের উপর এই এলাকায় বারবার গুলি চালানো হয়েছে । সবকিছু মিলিয়ে একটি ধোয়াশাচ্ছন্ন পরিবেশ। কিন্তু আমরা নজর রাখছিলাম আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া কতিপয় সদস্যের উপর।তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে আমরা বুঝতে পারি, তারা টিএসসি’র চেয়ে বাংলা মোটরকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে । এবং তাদের এই অতি গুরুত্ব দেবার পেছনের কারণ আমরা আগেই আন্দাজ করেছিলাম। আমাদের সন্দেহই শেষ পর্যন্ত সত্যি প্রমাণিত হয়েছে। বৈষম্য বিরোধী তথা এনসিপির কার্যালয় বাংলা মোটরের রূপায়ন টাওয়ারে। আবার সেখান থেকে একই রোডের খানিক দূরেই মগবাজারে জামায়াতের পার্টি অফিস। এখন টিএসসি,বাংলামোটর এবং মগবাজারকে যদি জ্যামিতিক শেপে নিয়ে আসি তাহলে এটি ট্রায়াঙ্গল তৈরি করে। এর সাথে রামপুরা যুক্ত করলে তৈরি হয় একটি ট্র্যাপিজয়েড,যার আকৃতি ঘুড়ির মত। আমরা যা বোঝাতে চাচ্ছি-যাদের জ্যামিতি নিয়ে বিশদ জ্ঞান আছে-তারা বুঝতে পারবেন।
অর্থাৎ যাত্রাবাড়ীতে যেই প্যাটার্নে স্নাইপার চালানো হয়েছে, সেই একই কায়দায় ট্র্যাপিজয়েড অঞ্চলেও চালানো হয়েছে। আবার যাত্রাবড়ীতে যারা লিড করেছে আন্দোলন,তারাই স্নাইপারের পেছনে ছিল। একই ঘটনা ঘটেছে বাংলামোটর এবং মগবাজার-রামপুরা এলাকায়। এখান থেকে এটি পরিষ্কার হলো যে, এই বিস্তীর্ণ এলাকায় স্নাইপারের পেছনে ছিল জামায়াত-এনসিপি। তবে যাত্রাবাড়ীতে আরো অনেক শক্তি বিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত ছিল। যেমন ছিল উত্তরা ও মোহাম্মদপুরে।





Add comment