‘আমি এত বছর রাজনীতি করছি। এখন কি আমি না খেয়ে থাকব? ভাই, আমি এখন শ্রাবণ মাসের পাগলা কুত্তার মতো হয়ে গেছি। মনে করেন আমি পাগল হয়ে গেছি। পাগল হয়ে গেলে সবার কাছ থেকেই ধরতে হয়।’
কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর শাহবাগে ওষুধের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠা তাসকিন গাজী। কোনো পদ না থাকলেও তিনি নিজেকে ছাত্রদল বা বিএনপির নেতা পরিচয় দেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এমন শাহবাগকেন্দ্রিক আরও কয়েকটি চরিত্র সামনে এসেছে। যারা একাধিক চক্র গড়ে তুলে ওই এলাকায় ওষুধের দোকানসহ বিভিন্ন ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ ও ‘নীরব চাঁদাবাজি’ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব চক্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এককালীন ও মাসিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট হারে টাকা নিচ্ছে। চাঁদার টাকা না পেয়ে দোকানকর্মীকে হুমকি, তুলে নিয়ে অর্থ আদায়, এমনকি গুপ্ত হামলা করে লুটপাটের ঘটনাও ঘটছে।
এ ছাড়া অ্যাম্বুলেন্স, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিইউ, ফুটপাতের চাঁদা ও ফুলের মার্কেটকেন্দ্রিক আলাদা চাঁদাবাজ গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি চাঁদার টাকা না পেয়ে পরীবাগ সুপারমার্কেটের একটি ওষুধের দোকানের কর্মচারীর ওপর গুপ্ত হামলা করা হয়। লোহার রড দিয়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তাঁকে আহত করে ৫২ হাজার টাকা ও প্রায় ২৫ হাজার টাকা মূল্যের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর আগে ওই দোকানে ছাত্রদল নেতা পরিচয় দেওয়া মো. মিথুন ও মো. বাইজিদ মোল্লা এক লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছিল বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় একটি মামলাও হয়েছে।

এমনই একজন ভুক্তভোগী পরীবাগ সুপারমার্কেটের শাহবাগ মেডিসিন কর্নারের স্বত্বাধিকারী। এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মো. মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে জানান, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে এসে দোকানে তালা দেয় ছাত্রদলের নেতা পরিচয় দেওয়া মো. মিথুন নামের এক ব্যক্তি। পরে স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ৮ আগস্ট দোকান খুলতে পারেন তিনি।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসায় ঝামেলা হতে পারে—এই ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না। প্রতি মাসে নির্ধারিত হারে চুপচাপ টাকা দিয়ে দেন। অনেকে আবার এককালীন টাকাও দিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শাহবাগের কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, দোকানভেদে নির্ধারিত হারে মাসিক টাকা দিতে হয়। এটাকে তাঁদের ভাষায় বলা হয় ‘রেট’। বেশির ভাগ দোকানই গড়ে ১০ হাজার টাকা মাসিক চাঁদা দেয়। অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, এমন ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে চাঁদার হার একটু বেশি।
ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে এ ধরনের চাঁদা নেওয়া মো. মিথুন (২৮) ও মো. বাইজিদ মোল্লার (২৮) নাম জানা যায়। যাঁদের মাধ্যমে চাঁদা তোলা হয়। দুজনই নিজেদের ঢাকা মহানগর পূর্ব শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি মো. আক্তার হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
পরীবাগের চাঁদ মসজিদ মার্কেটের ওষুধ ব্যবসায়ী আল-আমিন (রিপন) প্রথম আলোকে বলেন, ‘মিথুন ও বাইজিদ বিভিন্ন সময় চাঁদার দাবিতে হুমকি দিয়েছেন। চাঁদা না পেয়ে দোকানের কর্মচারীদের মারধর করেছেন। আমরা ব্যবসা করতে চাই। ঝামেলা চাই না। এ জন্য চুপচাপ সব সয়ে গেছি; কিন্তু এখন এমন শুরু করেছে, ব্যবসা করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই এলাকায় সবাই বিএনপি পরিচয় দেয়; কেউ কাউকে মানে না।





Add comment