BDSUN.NEWS
জ্বালানি সংকটে বাংলাদেশ

গ্যাসের জন্য হাহাকার , নির্বিকার সরকার

কৃত্রিম সংকট তৈরি করে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট

ভোগান্তির সকল সীমা অতিক্রম

বেশ কিছুদিন ধরেই রাজধানীতে চলছিল তীব্র গ্যাস সংকট । সাপ্লাই লাইন থেকে আসা গ্যাসের চাপ এতই কম ছিল যে, তা দিয়ে রান্না করা সম্ভব হচ্ছিল না । স্বভাবতই তাই অনেক পরিবার এ সংকট থেকে উত্তরণে সিলিন্ডার গ্যাসে আস্থা খোঁজার চেষ্টা করেন । কিন্তু বিধি বাম ।

বৈধ কোনো কারণ ছাড়াই সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট শুরু হয় দেশ জুড়ে । দেশবাসী ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করেনি যে, দুর্ভোগ সকল মাত্রা অতিক্রম করতে যাচ্ছে । শীতের কারণে গ্যাসের চাপ অনেক কম- এই দোহাই দিয়ে গ্যাস সাপ্লায়ার কোম্পানিগুলো নিজেদের দায় সারার চেষ্টা করেন । কিন্তু, শীতের প্রকোপ কমার পরেও সংকটের কোনো সমাধান তো হয়ই নি , বরং তিন গুণ বেড়েছে । তবে, সরকার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসে এলপিজি বা সিলিন্ডার গ্যাসের  মূল্য বৃদ্ধি করলে , জনগণ বুঝতে পারে তারা সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছেন ।

সোর্সঃ ইত্তেফাক

কিন্তু দাম বৃদ্ধিও কোনো কাজে আসেনি । রাজধানীর সংকটটি বরং পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে  । দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষের সাথে কথা বলে আমরা জানতে পেরেছি , সিলিন্ডার নেই – এই অজুহাতে খুচরো ব্যবসায়ীরা বিক্রি বন্ধ রেখেছে । তবে, খুবই পরিচিত ক্রেতাদের নিকট চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে গ্যাস ।

নিলে নে, না নিলে ভাগ

অন্যদিকে, ভোক্তা অধিকার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডিলারদের গুদামে অভিযান চালিয়ে সংকটকে আরো বৃদ্ধি করেছে । স্থানীয় পর্যায়ের ডিলাররা বলছেন , আমরা বড় ডিলারদের কাছ থেকে মৌখিক চুক্তিতে সিলিন্ডার আনি । বিক্রির পর বাকির টাকা পরিশোধ করি । কাগজ চাইলে বড় ডিলাররা বলে “নিলে নে, না নিলে ভাগ ।”

আমি হয়েছি ভিলেন । আমার জরিমানার টাকাও গেল, চরিত্রও গেল

ছবিঃ সংগৃহীত

অথচ, বড় ডিলার বা কোম্পানিতে হানা দিচ্ছে না ভোক্তা অধিকার । এসব জায়গায় অভিযান চালানোর ক্ষমতা ভোক্তা অধিকারের আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ । নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুরের এক স্থানীয় ডিলার জানিয়েছেন , ভোক্তা অধিকারের ম্যাজিস্ট্রেটরা আসেন – বাস্তবতা না বুঝেই জরিমানা করেন । রাতে বাসায় গিয়ে দেখি ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব ভাইরাল হয়ে হিরো বনে গেছেন । আর আমি হয়েছি ভিলেন । আমার জরিমানার টাকাও গেল, চরিত্রও গেল ।

এদিকে গ্যাস সংকটের এই ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে নেমেছে সাপ্লায়ার কোম্পানিগুলোও । যেসব ব্র্যান্ডের গ্যাস আগে কম চলত , তারা ট্রাক ভর্তি করে বিভিন্ন এলাকায় ভোরের দিকে গ্যাস সরবারহ করছেন । যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল । কিন্তু এখানেও দেখা যাচ্ছে জনগণকে জিম্মি করে অতিরিক্ত মুনাফা লোফার এক অনন্য চিত্র । ফ্রেশ ও ইউনিগ্যাস ব্রান্ডের সিলিন্ডারবাহী গাড়িগুলো ভোরে এসে নিজেদের এজেন্টদের গ্যাস দিলেও ,শর্ত দিচ্ছে – তাদের ব্রান্ডের সিলিন্ডার ফেরত দিলেই কেবল গ্যাস দেয়া হবে । যারা তা দিতে পারছেন না , তারা সিলিন্ডারসহ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন । ফলে, ভোক্তা পর্যায়ে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ৩৫০০ -৫০০০ টাকায় উঠেছে । যদিও চাহিদার তুলনায় তা খুবই নগণ্য ।

আমাদের  বাসাতেই দুই-তিনটি সিলিন্ডার পড়ে আছে । তাহলে, সিলিন্ডারসহ আবার গ্যাস কিনব কেন ?

কেরাণীগঞ্জ ও মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকার বেশ কয়েজন ভুক্তভোগীর সাথে কথা হয় আমাদের । তারা জানিয়েছেন , ভোর চারটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও গ্যাস পাইনি । তাদের ব্রান্ডের  সিলিন্ডার দিলেই কেবল গ্যাস পাওয়ার ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকছে  । টানা কয়েকদিন ঘোরার পর গ্যাস পাবার আশা ছেড়ে দিয়েছি । আবার , স্থানীয় পর্যায়ে যে সব  ব্যবসায়ী গ্যাস পাচ্ছেন , তারা সিলিন্ডারসহ কিনতে বলছেন । আমাদের  বাসাতেই দুই-তিনটি সিলিন্ডার পড়ে আছে । তাহলে, সিলিন্ডারসহ আবার গ্যাস কিনব কেন ?

এদিকে  সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া অনেক ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে , গ্যাস না পেয়ে অনেকেই প্রতিবাদ  জানিয়ে মাটির চুলোয় রান্না করছেন । অনেকেই আবার জানিয়েছেন, বাসায় রান্না করতে না পারায় হোটেলে যাচ্ছেন । হোটেলগুলোও গ্যাস সংকটের কারণে খাবার যোগান দিতে পারছে  না । যারা পারছেন , তারাও  আবার চড়া মূল্যে খাবার বিক্রি করছেন । একজন হোটেল ব্যবসায়ী জানিয়েছেন , দিনে আমার তিন সিলিন্ডার গ্যাস লাগে । আগে চার থেকে সাড়ে চার  হাজার টাকার মধ্যে পেতাম । এখন তা কিনতে হচ্ছে আট থেকে দশ হাজার টাকায় । এই অতিরিক্ত খরচ তোলার জন্য খাবারের দাম না বাড়িয়ে কোনো উপায় আছে ?

সব থাকার পরেও যেন দুর্ভিক্ষ চলছে

এই কৃত্রিম সংকটে মধ্যবিত্তদের অবস্থা হয়েছে আরো সঙিন । যাদের রাইস কুকার আছে , তারা খিচুড়ি খেয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন । আর যাদের সে অবস্থাও নেই , তারা ধার-হাওলাদ করে ইলেক্ট্রিক চুলোর দিকে ঝুঁকছেন । তবে, বড় পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তিনটি ইউনিট বন্ধ থাকায় , শীত কালেও লোড শেডিং অসহনীয় মাত্রায় গিয়ে ঠেকেছে । ফলে, ইলেক্ট্রিক চুলোয় তিন বেলা রান্না করা যাবে, এমন গ্যারান্টিও কেউ দিতে পারছে না । ভুক্তভোগী একজন জানিয়েছেন , “সব থাকার পরেও যেন দুর্ভিক্ষ চলছে । ” অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি জালিয়াত চক্রের আবির্ভাব হয়েছে । যারা বিভিন্ন ফেসবুক পেজের মাধ্যমে সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সরবরাহ করার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন । দিশেহারা মানুষ গ্যাস পাবার আশায় মূল্য পরিশোধ করার পর বুঝতে পারছেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন ।

এদিকে, গ্যাস আমদানি করে সংকট মেটানো হবে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে দায় সারা বক্তব্য এসেছে । বিশ্লেষকরা বলছেন , আমদানির যে প্রক্রিয়া -তাতে বাংলাদেশে সিলিন্ডার আসতে আসতে অন্তত মাস তিনেক লাগবে ।

কোনো কোনো বিশ্লেষক আবার ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছেন । তারা বলছেন , আমেরিকাকে খুশি করতেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার । দেশে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার গ্যাস  থাকলেও আমেরিকাকে খুশি করতেই সেখান থেকে গ্যাস আমদানি  করা হবে । আর অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে এক ধরণের উইন-উইন সিচুয়েশন চলছে । যুক্তরাষ্ট্রকে খুশি করতে আমদানি করা হচ্ছে গ্যাস । আর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির ফলে ইতোমধ্যেই চল্লিশ হাজার কোটি টাকার মত অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন  করেছে  ব্যবসায়ীরা । আবার, এই ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা গ্যাসের ডিস্ট্রিবিউটর হবে । এটি রাষ্ট্রীয় প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয় ।

অর্থনীতিবিদদের ধারণা যে মিথ্যা নয় , সেটি পরিষ্কার হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসের সম্প্রতি জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণ থেকে । নির্বাচন, গণভোট , সংস্কার নিয়ে উনি কথা বললেও গ্যাস সংকট নিয়ে  টু শব্দটিও করেননি । ফলে সরকারের নিকট জনগণ এখন তুচ্ছ , গণভোটই এখন মূখ্য । অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ,  আসন্ন নির্বাচনে সিলিন্ডার প্রতীকে কেউ নির্বাচন করলে হয়ত তিনি অনায়াসেই পাশ করতেন ।

bdsun.news

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.